/শফিকুল ইসলাম বেবু/
কুড়িগ্রাম, ৩১ আগস্ট ২০২৫ (বাসস) : বর্তমান যুগে পণ্য পরিবহনে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। চাকার সঙ্গে সম্প্রসারিত অংশ (বডি) যোগ করে নানা ধরনের বাহন বিশ্বে তৈরি করা হয়েছে। অথচ কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর ধরলা নদীর চরাঞ্চলে পণ্য পরিবহনে আজও ভরসা ঘোড়ার গাড়ি।
মধ্যপ্রাচ্য অথবা মরুভূমি অঞ্চলের পরিবহন ব্যবস্থায় উটের অগ্রণী ভূমিকা থাকলেও কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় পণ্য পরিবহনে যুগের পর যুগ ব্যবহৃত হচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন শতাধিক চরাঞ্চলের মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী আনা-নেওয়া করা হচ্ছে ঘোড়ার গাড়িতে করে।
সরেজমিনে উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের গোরকমণ্ডল, চরগোরকমণ্ডল, পশ্চিম ফুলমতি দুর্গম চরগুলোতে সহজেই চোখে পড়ে নিত্যপণ্যসহ বিভিন্ন মালামাল পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে এসব গাড়ি। ধু ধু বালুময় চরের ওপর দিয়ে মালামাল নিয়ে ছুটে চলেছে শত শত ঘোড়ার গাড়ি। শুধু নাওডাঙ্গা ইউনিয়নে নয়, উপজেলার ৬ ইউনিয়নের প্রায় দেড় থেকে ২ হাজার ঘোড়ার গাড়িচালক পণ্য পরিবহন করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।
চরাঞ্চলের ব্যবসায়ী ও কৃষকরা জানায়, এলাকা জুড়ে চরাঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য এবং ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহনে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। এসব চরাঞ্চলে যান্ত্রিক যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় ঘোড়ার গাড়িই পণ্য পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি গাড়িতে ১৫ থেকে ২০ মণ পণ্য অনায়াশেই পরিবহন করা যায়।
পশ্চিম ফুলমতি কলাবাগান এলাকার ঘোড়ার গাড়িচালক শহিদুল ইসলাম মিয়া ও চরগোরকমণ্ডল সামেশ আলী জানান, তারা প্রত্যেকেই ৮ বছর ধরে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।ওই গ্রামসহ নাওডাঙ্গা ইউনিয়নে প্রায় দুই শতাধিক ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। প্রত্যেক ঘোড়াচালক দিনে কমপক্ষে ৮০০ ও সর্বোচ্চ ১৫০০ এমনকি ২ হাজার টাকাও আয় করেন।
তারা বলেন, দিনে ঘোড়ার খাবার বাবদ খরচ হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। একটি ঘোড়ার গাড়ি তৈরি করতে ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা লাগে।
চরগোরকমণ্ডল এলাকার ঘোড়ার গাড়িচালক আলামিন, রমজান আলী ও একরামুল হক জানান, আগে তারা গরুর গাড়িতে করে পণ্য পরিবহন করতেন। গরুর গাড়িতে দুটি গরু বা মহিষ লাগায় খরচও বেশি। অথচ ঘোড়ার গাড়িতে একটি ঘোড়া হলেই হয়। এতে খরচও অনেক কম পড়ে।
তারা জানান, চরাঞ্চলে বালু বেশি থাকায় মালামাল পরিবহনে অন্য কোনো যানবাহন চলাচল সম্ভব হয় না। খুব সহজেই ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মানুষসহ মালামাল আনা-নেওয়া করা যায়। এতে সারাদিনে ৮০০, ৯০০ এমনকি হাজার টাকা আয় হয়। এ দিয়েই আমরা সংসারের ব্যয় বহন করি।
বালারহাট বাজারে কাঠ ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ জানান, চরাঞ্চল ও দোলায় ট্রাক্টর ও ভ্যান গাড়ি যেতে পারে না। সেক্ষেত্রে ঘোড়ার গাড়িতে করে সব জায়গায় গিয়ে সব ধরনের মালামাল বহন করা যাচ্ছে। এতে খরচ একটু বেশি হলেও সুবিধা আছে অনেক।
বালারহাট বাজারের তানিয়া স্টোরের মালিক আবু তালেব জানান, বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি থাকায় পণ্য পরিবহন সহজ হলেও শুকনো মৌসুমে বালুর গভীরতা বেশি থাকায় ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না।
চরগোরকমণ্ডল ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আয়াজ উদ্দিন জানান, তার গ্রামে প্রায় শতাধিক ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। এসব গাড়ি প্রতিদিনই পণ্য আনন্দ বাজার থেকে বালারহাট বাজারে নিয়ে যাওয়া আসা করে।
নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজ অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার, এক সময় ঘোড়ার পিঠে রাজা বাদশারা চড়ত। মূলত ঘোড়াই তাদের চলাচলের একমাত্র বাহন ছিল। সেই প্রথা বিলুপ্তির পর ঘোড়া পণ্য পরিবহনে ব্যবহার হচ্ছে। শুধু চরাঞ্চলে নয়, এখন অনেক স্থানে পরিবেশ বান্ধব ঘোড়ার গাড়ি পণ্য পরিবহনসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হচ্ছে।