রাজশাহী, ২৯ আগস্ট, ২০২৫ (বাসস) : ভাল ও উন্নতমানের চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভাগিয়ে নিচ্ছেন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালরা। এতে ভোগান্তিতে পড়ছে রোগীরা।
দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত শহরের বাইরে থেকে আসা রোগীরা প্রতারিত হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে বাড়ি ফিরছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রামেক হাসপাতালকে কেন্দ্র করে নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় প্রায় শতাধিক ক্লিনিকসহ ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এতগুলো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো দালাল নির্ভর। দালালের উপর ভিত্তি করেই এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলছে। দালালরা সরকারি হাসপাতালের রোগী ভাগিয়ে নিলে কমিশন পাওয়ায় ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই শুধু আল্ট্রাসনোগ্রাম, এক্সরে ও রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। এ ছাড়া অন্য কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় না।
প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার কাজ করে দালালরা। সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় হাসপাতাল বহির্বিভাগের কার্যক্রম। বহির্বিভাগের কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই দালালরা চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে ওৎ পেতে থাকে। কোনো রোগী চিকিৎসকের চেম্বার থেকে বের হওয়া মাত্র দালালরা ভাল চিকিৎসার কথা বলে বাইরের প্রতিষ্ঠানে ভাগিয়ে নিয়ে চলে যায়। এরপর রোগীকে তারা প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় অসংখ্য পরীক্ষা করিয়ে টাকা আদায় করে। কেউ টাকা দিতে অপারগ হলে তাকে কোনো রিপোর্ট দেওয়া হয় না বলেও রোগীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে।
দালালরা সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত রামেক হাসপাতালের বহির্বিভাগের বিভিন্ন চিকিৎসকের চেম্বার, প্যাথলজি, টিকিট কাউন্টার, রেডিওলজি বিভাগের সামনে অবস্থান নেয়।
অনেক সময় চিকিৎসকরা রোগীদের হাসপাতালের মধ্যের প্যাথলজিতে টেস্ট করতে দিলেও দালালরা ভেতরে এ টেস্ট হবে না বলে বাইরে নিয়ে চলে যায়। বর্তমান সময়ে দালালরা প্রকাশ্যে রোগী ভাগানোর কাজ করলেও পুলিশ-আনসার সদস্যদের তেমন দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায় না। যদিও মাঝে মাঝে আনসার সদস্যরা ২/১ জন দালালকে আটক করে। তবে সেই হার একেবারেই কম। আবার মাঝে মাঝে রোগী ধরা দালালরা বাইরে থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার এবং মারমুখী আচরণ করে এমন অভিযোগও রয়েছে।
দালালরা চাকুরির ডিউটির মতো সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অবস্থান করলেও পুলিশের হাতে আটক হয় না। তবে রোগীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে নতুন কোন দালাল প্রবেশ করলে আটক হয়ে যায়। পুরাতনরা মাসোয়ারা দিয়েই দালালি করে বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি থাকে।
এদিকে, বহির্বিভাগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইনডোরে শুরু হয় দালালদের তৎপরতা। দালালরা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের বাইরের ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিকে নিয়ে চলে যায়। বাইরের প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে অনেক টেস্ট দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। আর এসবের কারণে হাসপাতাল পাড়ায় গড়ে উঠেছে দালাল সিন্ডিকেট। বাইরের কোন রোগী দালালদের সঙ্গে যেতে না চাইলেও অনেক সময় জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়। দালাল সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাইরে থেকে আসা রোগীদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে এ কাজ করতে বাধ্য করায়।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা দালাল ছাড়াও রোগী ধরার ফাঁদ হিসেবে মার্কেটিং ম্যানেজার ও মার্কেটিং অফিসার নিয়োগ দেয়। যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় সরকারী হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে আসার। আর এ কাজ করতে পারলেও চিকিৎসার মোট বিলের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দেওয়া হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে আবার কমিশন আরো বেশি দেয়া হয়।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক রোগী জানান, হাসপাতালের দালালরা যেভাবে রোগী ধরে নিয়ে যায় তা নজিরবিহীন। তাই তিনি তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার আহ্বান জানান। আলম নামের এক রোগীর স্বজন বলেন, আমরা ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হওয়া মাত্রই দালাল দেখি বলে বাইরে নিয়ে গেছে। আমরা ভয়ে সেভাবে কিছু বলতে পারিনি। অনেক রোগী ও স্বজনদের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, দালাল নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালে আনসার কাজ করে। হাসপাতালের কর্মচারিরাও বিষয়টি খেয়াল রাখে। মাঝে মাঝে দালাল আটক করা হয়। বিষয়টি আরো গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে যাতে কোনো রোগী চিকিৎসা নিতে এসে হয়রানি না হয়।