ঢাকা, ১১ মার্চ, ২০২৫ (বাসস) : বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ লোক কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। তবে, সবাই যদি কিডনি রোগের ব্যাপকতা, ভয়াবহতা, পরিণতি ও কারণ সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং স্বাস্থ্য সম্মত জীবনযাপন করে তাহলে ৬০-৭০ ভাগ ক্ষেত্রে এই মরণঘাতী কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা সম্ভব।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিডনি এওয়ারনেস মনিটরিং এন্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস) আয়োজিত ‘কিডনি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণ: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব তথ্য জানান।
তারা বলেন, বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত বেড়েই চলছে কিডনি রোগ। উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে কিডনি রোগের হার সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশেও এই রোগের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে উর্ধ্বমুখী। কিডনি রোগের কারণে শুধু ব্যক্তিগত জীবনই বিপর্যস্ত হয় না, এই রোগ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপরও বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।
বক্তারা আরও বলেন, কিডনি রোগের মারাত্মক পরিণতি, অতিরিক্ত চিকিৎসা খরচ এবং চিকিৎসা ব্যয় সাধ্যাতীত হওয়ায় সিংহভাগ রোগী প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করে।
বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ শুধু দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। এই সংখ্যা ডায়াবেটিস রোগীদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ এবং ক্যান্সার রোগীদের চেয়ে প্রায় বিশ গুণ।
গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে কিডনি এওয়ারনেস মনিটরিং এন্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) সভাপতি ও আনোয়ার খান মডার্ণ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ বলেন, কিডনি রোগ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে একটি। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে কিডনি রোগের প্রকোপ বাড়ছে, বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্থূলতার মতো অসংক্রামক রোগের কারণে।
ডা. এম এ সামাদ বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ শুধু দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। এই সংখ্যা ডায়াবেটিস রোগীদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ এবং ক্যান্সার রোগীদের চেয়ে প্রায় বিশ গুণ। মৃত্যুর কারণ হিসেবে কিডনি রোগ ১৯৯০ সালে ছিল ১৯তম স্থানে, বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৭ম স্থানে, এভাবে চলতে থাকলে ২০৪০ সালে দখল করে নেবে ৫ম স্থান। আবার উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে কিডনি রোগের হার সবচেয়ে বেশি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশেও কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক। তথ্য মতে, প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ লোক কোন না কোন কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার কিডনি রোগী ডায়ালাইসিসের উপর নির্ভরশীল হয়। শহর ও গ্রামাঞ্চলে সমানভাবে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। দারিদ্র্য, অসচেতনতা, চিকিৎসা সেবার অপ্রতুলতা এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এই রোগ আমাদের দেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা।
কিডনি রোগের কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্থূলতা, নেফ্রাইটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, ব্যাথানাশক ঔষধের অতিরিক্ত ব্যবহার, জন্মগত ও বংশগত কিডনি রোগ, মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ ও পাথুরে রোগী। প্রায় সবগুলো কারণই আমাদের অস্বাস্থ্যকর জীবন ধারার সঙ্গে জড়িত, তবে একটু সচেতন হলে প্রতিরোধ যোগ্য। তাছাড়া যারা ঝুঁকিতে আছেন যেমন যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ওজন বেশী, বংশে কিডনি রোগ আছে, যারা ধূমপায়ী, যারা তীব্র মাত্রার ব্যাথার ঔষধ খেয়েছেন, যাদের পূর্বে কোন কিডনি রোগের ঝুঁকি আছে তাদের বছরে অন্তত ২ বার প্রস্রাব ও রক্তের ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করে নেয়া উচিৎ। কেননা প্রাথমিক অবস্থায় কিডনি রোগ শনাক্ত করতে পারলে চিকিৎসার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
বাংলাদেশ রেনাল এসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে কিডনি রোগের প্রার্দুভাব বেড়েই চলছে। বাংলাদেশে কিডনী সমস্যা বাড়ার কারণ ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্থূলতা, নেফ্রাইটিস ইত্যাদি। এছাড়া জন্মগত সমস্যা তো আছেই। কিডনী রোগের শেষ স্টেপে যারা আছেন তাদের জন্য ডায়ালাইসিস লাগে। বাংলাদেশ ১৪৬টির মতো ডায়ালাইসিস সেন্টার আছে। তার মধ্যে ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ ঢাকার মধ্যে। প্রান্তিক পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা এখনো অপ্রতুল। তবে, আশার কথা হলো বিগত সরকার প্রতি জেলায় ১০ বেডের একটি ডায়ালাইসিস সেন্টার শুরু করেছিলেন। এই প্রজেক্ট এখনো চালু রয়েছে। আমরা আশা রাখছি খুব দ্রুতই জেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু হবে।
তিনি বলেন, দেশের অনেক জায়গায় কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করা যায়। কিন্তু এখানে বড় সমস্যা হলো দাতা সমস্যা। আমরা আইন অনুয়ায়ী দাতা পাই কিন্তু আমরা দাতা সংকটে ভুগছি। তবে, আইন সংশোধন হলে আরও দাতা পাওয়া যাবে। ডায়ালাইসিস করে একজন রোগীর সমস্যা সমাধান করা যাবে না। কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করলে একজন রোগীকে স্বাভাবিক করা যেতে পারে।
পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আফরোজা বেগম বলেন, বাচ্চারা আমাদের অত্যন্ত প্রিয়। যখন বাবা মা শুনে বাচ্চার কিডনী বিকল হয়ে গেছে। তখন তারা আমাদের কাছে জানতে চায় কি ওষধ খেলে ভালো হবে। তখন আমাদের ওইসব অভিভাবকদের বলতে কষ্ট হয় যে একবার কিডনী বিকল হলে আর ভালো হয় না। বাচ্চাদেরও কিডনী রোগ হয় তবে সেটি প্রতিরোধযোগ্য। প্রাথমিকভাবে যদি সচেতনতা থাকে এবং দ্রুত শনাক্ত করা যায় তাহলে অনেকাংশে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। অপরিণত বাচ্চা জন্ম দিলে তার কিডনীও অপরিণত থাকে। বয়স বাড়লেও এই অপরিণত কিডনী নিয়ে বড় হতে থাকে এবং সারা শরীরের বোঝা যখন কিডনীর উপর পড়ে তখন কিডনী বিকল হয়ে যায়। সেজন্য অপরিণত বাচ্চা হলে সবসময় তত্বাবধানে রাখতে হবে।
কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন-উর-রশিদ বলেন, পৃথিবীর সব দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও ডায়াবেটিসের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। ডায়াবেটিস ২০১০ সালে ছিলো ৬ শতাংশ এখন ১১ শতাংশ। কিডনী রোগের প্রধান তিনটি কারণের মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, নেফ্রাইটিস। ৫০ থেকে ৬০ ভাগ রোগী জানেই না তার শরীরে ডায়াবেটিস রয়েছে। ৫৫ থেকে ৬৫ ভাগ রোগী জানেই না তার শরীরে উচ্চ রক্তচাপ আছে। এগুলো যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায় তাহলে বাংলাদেশে কিডনী রোগের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।
ক্যাম্পসের নির্বাহী পরিচালক রেজওয়ান সালেহীন বলেন, ক্যাম্পস কিডনি রোগ প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত সচেতনতার বাণী প্রচার করে যাচ্ছে। আমরা যদি কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলি তা হলে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই সরকারী ও বেসরকারী পর্যায় থেকে যদি সকলে এগিয়ে আসেন তা হলে এই রোগ নিরাময় করা অনেকটাই সহজ হবে।
এছাড়া গোলটেবিল বৈঠকে দেশের সরকারি পর্যায়ের নীতি নির্ধারক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।