ঢাকা, ১১ মার্চ, ২০২৫ (বাসস): র্যালি, সেমিনার ও লিফলেট বিতরণসহ জনসচেতনামূলক নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে বিএসএমএমইউ'তে চোখের নীরব ঘাতক বিশ্ব গ্লকোমা সপ্তাহ, ২০২৫ শুরু হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সি ব্লকের সামনে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। এ র্যালির প্রধান অতিথির বক্তব্যে গ্লকোমা চিকিৎসায় বিএসএমএমইউ-কে রোল মডেল হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম।
এ সময় এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, গ্লকোমা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। শুরুতেই এই রোগ চিহ্নিত করা গেলে, চিকিৎসার মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সচেতনতার মাধ্যমে রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিএসএমএমইউ-তে গ্লকোমা রোগের চিকিৎসার জন্য গ্লকোমা ক্লিনিক রয়েছে। এখানে চোখের রোগসমূহের সর্বাধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে চক্ষু বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসাসেবা ও গবেষণার ব্যবস্থা।
এখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের খ্যাতনামা ফ্যাকাল্টিরা রয়েছেন। তাই বিএসএমএমইউ-কে এখন চোখের নীরব ঘাতক গ্লকোমা চিকিৎসায় রোল মডেল হতে হবে। চোখের চিকিৎসায় এভিডেন্স বেইসড মেডিসিনকে গুরুত্ব দিতে হবে ও গাইডলাইন ফলো করে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হবে।
এবারে বিশ্ব গ্লকোমা সপ্তাহের স্লোগান হল- ‘এক সাথে হাত ধরি, গ্লকোমা মুক্ত বিশ্ব গড়ি’। বিএসএমএমইউ’র চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগ ও কমিউনিটি অফথালমোলজি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে এ সকল আয়োজনে বিএসএমএমইউ’র সম্মানিত উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু নোমান মোহাম্মদ মোছলেহ উদ্দীন, চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আব্দুল ওয়াদুদ, কমিউনিটি অফথালমোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শওকত কবীর, চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শফিকুল ইসলাম, সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. জাফর খালেদ, বাংলাদেশ গ্লকোমা সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক ডা. সিদ্দিকুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক ডা. তারিক রেজা আলী, ডা. শাহ নূর হাসান, ডা. শামস মোহাম্মদ নোমান, ডা. মোহাম্মদ শীষ রহমান ডা. মো. গোলাম ফারুক, সহকারী অধ্যাপক ডা. নিরুপম চৌধুরী, ডা. মেহজাবিন হক, ডা. রাজশ্রী দাশ, ডা. জাহিদা জব্বার, ডা. সোনিয়া আহসান, ডা. তাজমেহ মেহতাজ ও ডা. মাজহারুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগ ও কমিউনিটি অফথালমোলজি বিভাগের শিক্ষক, চিকিৎসক ও রেসিডেন্টরা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্ব গ্লকোমা সপ্তাহের আয়োজকরা জানান, গ্লকোমা চোখের এমন একটি রোগ, যাতে চোখের চাপ বেড়ে গিয়ে চোখের পেছনের স্নায়ু অকার্যকর হয়ে ধীরে ধীরে চোখের দৃষ্টি চলে যায়। গ্লকোমা হল বাংলাদেশ, তথা পৃথিবীতে অনিবারণযোগ্য অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ।
তারা আরো জানান, বিএসএমএমইউ-তে রয়েছে ভিজুয়্যাল ফিল্ড অ্যানালাইসিস, কালার ফান্ডাস ফটে, ও.সি.টি, গ্লকোমা লেজার, ট্রাবেকুলেকটমি অপারেশন, কম্বাইন্ড অপারেশন (ছানি ও গ্লকোমা), বাচ্চাদের গ্লকোমা অপারেশন, গ্লকোমা টিউব ইমপ্ল্যান্ট, কোলাজেন ইমপ্ল্যান্ট ইত্যাদি। যেকোনো বয়সে এ রোগ হতে পারে। জন্মের সময় বেশ বড় চোখ বা চোখের চাপ নিয়ে জন্মালে একে কনজেনিটাল গ্লকোমা বলে। তরুণ বয়সেও এ রোগ হতে পারে, একে বলে জুভেনাইল গ্লকোমা।
বেশির ভাগ গ্লকোমা রোগ ৪০ বছরের পরে হয়। এদের প্রাথমিক গ্লকোমা বলে। এছাড়াও পারিবারিকভাবে যাদের এ রোগ আছে, যারা মাইনাস পাওয়ার চশমা পড়েন বা যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ আছে তাদের মধ্যে এ রোগ হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
বেশি বয়সজনিত চোখের গঠনে পরিবর্তন, জন্মগত গঠনের ক্রটি, আঘাত, চোখ লাল হওয়া, ডায়াবেটিসজনিত চোখের রক্তহীনতা, অনিয়ন্ত্রিত স্টেরই বা হরমোন থেরাপি ও ছানি পেকে যাওয়া ইত্যাদি কারণেও গ্লকোমা হতে পারে।
তারা জানান, প্রাইমারি গ্লকোমা সাধারণত ২ চোখে হয় এবং যেকোনো বয়সে হতে পারে। এর কারণ হল চোখের গঠনগত পরিবর্তন। আর একটি হল সেকেন্ডারি গ্লকোমা, এটা সাধারণত এক চোখে হয়। আঘাতজনিত কারণে ও ঘন ঘন চোখ লাল বা প্রদাহ জনিত কারণে এই রোগ হতে পারে। এই রোগের উপসর্গের মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের উপসর্গ নিয়ে রোগীরা ডাক্তারের কাছে আসতে পারে। হঠাৎ করে এক চোখে প্রচন্ড ব্যাথা হয়ে দৃষ্টি শক্তি কমে যাওয়া, তার সাথে প্রচন্ড মাথা ব্যাথা ও বমি বমি ভাব হতে পারে। আবার, সব সময় চোখ ও মাথায় হালকা ব্যাথা (বিশেষ করে কম আলোতে) এবং আস্তে আস্তে দৃষ্টি শক্তি কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে ব্যথাবিহীন উভয় চোখের দৃষ্টি শক্তি ধীরে ধীরে কমে যাওয়া এবং চশমার পাওয়ার পরিবর্তন নিয়েও রোগীরা ডাক্তারের কাছে আসে। মাঝে মাঝে দৃষ্টি সীমানার যে কোন এক পাশে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, ছানি পেকে চোখে লাল হওয়া ইত্যাদিও এ রোগের উপসর্গ হতে পারে।
জন্মগত বড় চোখ, চোখ হতে পানি পড়া ও আলোতে চোখ বন্ধ করে ফেলা জন্মগত গ্লকোমা লক্ষণ হতে পারে। রোগীর ইতিহাস ও বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে গ্লকোমা রোগ নির্ণয় সম্ভব।
এর মধ্যে দৃষ্টি শক্তি পরীক্ষা (ভিসুয়াল একুইটি), চোখের চাপ পরীক্ষা (ইন্ট্রাঅকুলার প্রেসার), গনিয়াস কপী বা চোখের কোণা পরীক্ষা ও অফথালমোসকপী বা চোখের স্নায়ু পরীক্ষা বেশী গুরুত্ব বহন করে।
স্বাভাবিক চোখের চাপ সাধারণ (১০-২১) মি.মি. মার্কারী। অস্বাভাবিক চোখের চাপ থাকলে সমস্ত পরীক্ষার মাধ্যমে গ্লকোমা সনাক্ত করে তাড়িৎ চিকিৎসা বাঞ্জনীয়।
এই রোগ প্রতিরোধে করণীয় হলো— পারিবারিকভাবে যাদের গ্লকোমা রোগের ইতিহাস আছে, তাদের নিয়মিত চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে চোখ পরীক্ষা করতে হবে, অল্প আলোতে কারো চোখ ও মাথা ব্যথা হলে ডাক্তারের পরামর্শ প্রয়োজন, চোখে ছানি পড়লে, তা পেকে যাওয়ার আগে অপারেশন করিয়ে নেয়া ভাল, চোখে প্রদাহ হলে, সেটা হতে গ্লকোমা হওয়ার আগে চিকিৎসা করানো প্রয়োজন, চোখে আঘাতের পর দেরী না করে চিকিৎসা করাবেন, স্টেরইড বা হরমোন থেরাপী যারা নেন, তারা নিয়মিতভাবে অন্তত ৩-৪ মাস অন্তর অন্তর চোখ পরীক্ষা করাবেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ কোন হাসপাতালে অভিজ্ঞ চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে চোখের ছানি অপারেশনসহ বিভিন্ন অপারেশন করালে অপারেশন পরবর্তী গ্লকোমা রোগের প্রাদুর্ভাব রোধ করা যায়, পরিশেষে জীবন যাত্রার অভ্যাস পরিবর্তন, যেমন- পরিমিত খাদ্যভ্যাস ও লবণ জাতীয় খাবার বর্জনের মাধ্যমে, তথা ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গ্লকোমা রোগের সম্ভাবনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।