।। মোতাহার হোসেন ।।
ঢাকা, ১২ মার্চ, ২০২৫ (বাসস) : বিশ্বজুড়ে দিন দিন বেড়েই চলছে কিডনী রোগীর সংখ্যা। উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে এই রোগের হার সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশেও এই রোগের প্রভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এই রোগের বড় কারণ অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ বলে জানিয়েছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। তবে, সচেতনতা ও স্বাস্থ্য সম্মত জীবনযাপনের মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিএসএমএমইউ-এর কিডনী রোগ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও কিডনী রোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল ইসলাম (সেলিম) বাসস’কে বলেন, বাংলাদেশের কিডনী রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাছে। এর বড় কারণ হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং নেফ্রাইটিস। আমাদের দেশে ডায়াবটিস, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে গেছে। চিকিৎসা দেওয়ার পরেও এটি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিডনী রোগের তিনটি কারণের মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ ডায়াবেটিস। একজন ব্যক্তির ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সাধারণত ৫ থেকে ১০ বছর পরে এর প্রভাবে কিডনীর সমস্যা হতে পারে। এক্ষেত্রে ধীরে ধীরে প্রসাবে প্রোটিন যায়। ক্রিয়েটিনেন লেভেন আস্তে আস্তে বাড়ে। বছর দশেক আগে কিডনী রোগের প্রধান কারণ ছিলো নেফ্রাইটিস। কিন্তু চিকিৎসা করে নেফ্রাইটিস ভালো হচ্ছে। কাজেই ডায়াবটিসকে কন্ট্রোল করতে না পালে কিডনী রোগ প্রতিরোধ করা যাবে না।
তিনি বলেন, কিডনী রোগ প্রতিরোধ করতে হলে প্রথমেই কোন সমস্যার কারণে এই রোগ হয়েছে সে সম্পর্কে জানতে হবে। তারপর সেটি সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। যদি ডায়াবটিসের সমস্যা হয় তাহলে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্যান্য কারণে হলেও চিকিৎসা করে সমাধাণ করতে হবে। যদি সমাধাণ না করা যায় তাহলে অধিক প্রোটিন প্রসাবের সাথে বের হয়। প্রোটিন বেশি হলে শরীরে পানি আসে। চিকিৎসা দেওয়ার পর ক্রিয়েটিন লেভেল যদি বাড়তে তাহলে বুঝতে হবে এটি ক্রনিক কিডনী রোগ। কিন্তু চিকিৎসা দেওয়ার পর যদি ভালো হতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে এটি একিউট কিডনী রোগ। চিকিৎসা করালে একিউট কিডনী রোগীকে স্বাভাবিক করা যায়। ক্রনিক কিডনী রোগীকে স্বাভাবিক করা যায় না। এটি বাড়তে থাকে।
কিডনী রোগের সর্বশেষ স্টেপের বিষয়ে তিনি বলেন, এন্ড স্টেজ কিডনী রোগের ক্ষেত্রে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট অন্যতম চিকিৎসা। যদি কারো এন্ড স্টেজ কিডনী রোগ হয় তাহলের প্রাথমিকভাবে ডায়ালাইসিস করতে হয়। যদি রোগীর সাথে মিলে এমন ডোনার পাওয়া যায় তাহলে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়। বাংলাদেশে কিডনী সংযোজনের জন্য বেশ কয়েকটি সেন্টার আছে। এর রেজাল্টও উন্নত বিশ্বের রেজাল্টের সমান। কিডনী নেওয়ার আগে ডোনারকে পরীক্ষা করা হয়। যদি ডোনারের ডায়াবটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং নেফ্রাইটিসের মতো কোন রোগ না থাকে তাহলে কিডনী নেওয়া হয়।
বাংলাদেশে কিডনী রোগের চিকিৎসা নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশে কিডনী রোগের চিকিৎসা খুব সীমিত। আমাদের দেশে সাধারণত মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কিডনী রোগের চিকিৎসা হয়। সাধারণত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হয়ত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তারপর কিডনী সেন্টারে চিকিৎসা নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়। বাংলাদেশে কিডনী রোগের চিকিৎসা উন্নত বিশ্বের মতই। এটি নিয়ে দেশে ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে। তবে, উন্নত বিশ্বে যে মানের গবেষণা হয়, আমাদের দেশে সেই মানের গবেষণা নেই। কিন্তু দেশের প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে গবেষণা হচ্ছে। কী কারণে এ রোগ হলো, এই রোগ ঠেকানোর জন্য কি কি প্রদক্ষেপ নিতে হবে সেটি বোঝার জন্য চেষ্টা চলমান আছে।
কিডনী ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন-উর-রশিদ বলেন, পৃথিবীর সব দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও ডায়াবেটিসের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। ডায়াবেটিস ২০১০ সালে ছিলো ৬ শতাংশ এখন ১১ শতাংশ। কিডনী রোগের প্রধান তিনটি কারণের মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, নেফ্রাইটিস। ৫০ থেকে ৬০ ভাগ রোগী জানেই না তার শরীরে ডায়াবেটিস রয়েছে। ৫৫ থেকে ৬৫ ভাগ রোগী জানেই না তার শরীরে উচ্চ রক্তচাপ আছে। এগুলো যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায় তাহলে বাংলাদেশে কিডনী রোগের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বের প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনী রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোন না কোনভাবে এ রোগে আক্রান্ত। দারিদ্র্য, অসচেতনতা, চিকিৎসা সেবার অপ্রতুলতা এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্থূলতা, নেফ্রাইটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, ব্যাথানাশক ঔষধের অতিরিক্ত ব্যবহার, জন্মগত ও বংশগত কিডনী রোগ, মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ ও পাথুরে রোগী কিডনী রোগের কারণ। এই রোগে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার কিডনী রোগী ডায়ালাইসিসের উপর নির্ভরশীল হয়। ১৯৯০ সালে এ রোগ ১৯তম স্থানে থাকলেও বর্তমানে ৭ম স্থানে রয়েছে। এ রোগের মারাত্মক পরিণতি, অতিরিক্ত চিকিৎসা খরচ এবং চিকিৎসা ব্যয় সাধ্যাতীত হওয়ায় সিংহভাগ রোগী প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। এই সংখ্যা ডায়াবেটিস রোগীদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ এবং ক্যান্সার রোগীদের চেয়ে প্রায় বিশ গুণ। কিডনি রোগের কারণে শুধু ব্যক্তিগত জীবনই বিপর্যস্ত হয় না, এই রোগ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপরও বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। তবে, প্রাথমিক অবস্থায় কিডনী রোগ শনাক্ত করতে পারলে এবং এ রোগের ব্যাপকতা, ভয়াবহতা, পরিণতি ও কারণ সম্পর্কে সচেতন হলে এ রোগের প্রতিরোধ সম্ভব।