রংপুর, ৬ জুলাই, ২০২৫ (বাসস) : জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে ন্যায়বিচার, সংস্কার ও নতুন সংবিধান- এই তিনটি লক্ষ্য অর্জন করতেই হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার লড়াই করছি, যেখানে বৈষম্য, ফ্যাসিবাদ, অন্যায়, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস থাকবে না। এই দেশ গড়তে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনায় ছাত্র-যুবকদেরই এগিয়ে আসতে হবে।’
১ থেকে ৪ জুলাই রংপুর বিভাগের আট জেলায় এনসিপি’র ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পথসভা ও জনসংযোগকালে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
শিক্ষার্থী, যুবক ও শ্রমিকসহ শত শত মানুষ এসব কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার এনসিপি’র উদ্যোগে নাহিদ ইসলামের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।
রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জায়গায় কৃষক, শ্রমিক ও দোকানদারসহ গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে নাহিদ ইসলাম ও এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা যখন মতবিনিময় করেন, তখন এক অনন্য পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা ১ জুলাই রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবানপুর গ্রামে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করেন। এরপর তারা ‘জুলাই অভ্যুত্থান’-এর বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে দেশব্যাপী পদযাত্রা শুরু করেন।
কবর জিয়ারত শেষে এনসিপি নেতারা শহীদ আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা শহীদের পিতা-মাতাসহ পরিবারের খোঁজ খবর নেন। সেখানেই নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন, ‘শহীদ আবু সাঈদের স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এই পদযাত্রা।’
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘গত বছরের ১৬ জুলাই আবু সাঈদের শহীদ হওয়া ছিল স্বৈরাচার পতনের টার্নিং পয়েন্ট। আমরা তখন ঢাকায় শহীদ মিনারে ছিলাম। শুনলাম, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে।’ ‘সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে শোক আর বিক্ষোভে ফেটে পড়ে মানুষ। আন্দোলনের রূপ বদলে যায়। হাজার হাজার মানুষ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার পর দেশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন জ্বলে ওঠে, যা পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে।’
নাহিদ বলেন, ‘আবু সাঈদ যে স্বপ্ন নিয়ে প্রাণ দিয়েছেন, আমরা সেই স্বপ্নের কথাই বলছি। সেজন্যই পদযাত্রার শুরুতেই তার কবর জিয়ারত করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই পদযাত্রা আমাদের জাতি গঠনের যাত্রা। আমরা দেশের ৬৪ জেলাতেই যাব। মানুষের কথা শুনব, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা জানব।’
তিনি জানান, জুলাই ঘোষণা ও সনদ বাস্তবায়নে এনসিপি অটল থাকবে। এ ঘোষণা বাস্তবায়নে কোনো বিলম্ব মেনে নেওয়া হবে না।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে বিচারের মাধ্যমে, সংস্কারের মাধ্যমে এবং নতুন সংবিধানের মাধ্যমে এগোতে হবে। এই লক্ষ্যে গঠিত হতে হবে গণপরিষদ। যারা ভাবছেন, রাস্তায় নামা মানুষ ফিরে গেছে, তাদের সতর্ক করে দিতে চাই—এই যাত্রা থামবে না।’
গাইবান্ধা পৌর পার্কে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে নাহিদ বলেন, ‘২০২৪ সালে আমরা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে হটিয়ে ভয় ভেঙে দিয়েছি। এখন আর ভয় দেখিয়ে নতুন সংস্কৃতি চালু করতে দেওয়া হবে না। মানুষের উচিত স্থানীয় সমস্যা নিয়েও নির্ভয়ে কথা বলা।’
রংপুর শহরের একটি সমাবেশে নাহিদ বলেন, ‘রংপুরের বিদ্রোহের ইতিহাস আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। রংপুর কৃষক বিদ্রোহ থেকে শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ, সবই আমাদের সাহস জোগায়। আমরা শোষিত মানুষের সংগ্রামের ঐতিহ্য নিয়ে এগোচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘আবু সাঈদের আত্মত্যাগই জুলাই আন্দোলনের সূচনা করে। রংপুর থেকেই সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সারা মাসব্যাপী এই পদযাত্রায় আমরা বলব শহীদ আবু সাঈদের স্বপ্নের কথা, বলব জুলাই অভ্যুত্থানের স্বপ্নের কথা। নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে নতুন সংবিধান দরকার।’
২ জুলাই লালমনিরহাটের মুস্তাফি মোড়ে পথসভা ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় জনতা ছাত্র-যুবক, কৃষক, শ্রমিক ও দোকানদাররা উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান নাহিদ ইসলাম ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে।
নাহিদ যখন তাদের কাছে নতুন বাংলাদেশ গড়ার সহযোদ্ধা হওয়ার আহ্বান জানান, তারা তাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন।
কুড়িগ্রামে এক সমাবেশে নাহিদ বলেন, ‘প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নই আসল উন্নয়ন। অথচ কুড়িগ্রামের মানুষ সব সময়ই অবহেলিত।’
তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনায় আর দেরি সহ্য করা হবে না। এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।’
৩ জুলাই নীলফামারীর এক সমাবেশে নাহিদ বলেন, ‘গঠনমূলক কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া নির্বাচন অর্থহীন।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও মুজিববাদী আদর্শে গড়া সংবিধান জনগণের অধিকার ও সম্মান রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। সে কারণে এ সংবিধান বাতিল করতে হবে।’
একই দিনে পঞ্চগড়ে একাধিক সমাবেশে নাহিদ বলেন, ‘এই আন্দোলন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য ছিল না। এটি ছিল নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে উজ্জীবিত একটি গণ-অভ্যুত্থান।’
নাহিদ বলেন, ‘আমরা এমন একটি রাজনীতি চাই, যা হবে জনগণের জন্য। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আর কাউকে যেন দাসের মতো বাঁচতে না হয়। নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এনসিপি জনগণের জন্য রাজনীতি করবে।’
৪ জুলাই ঠাকুরগাঁওয়ে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে হবে। সব এলাকায় সমানভাবে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এটি শেখ হাসিনার বাংলাদেশ নয়। এটি গণ-অভ্যুত্থানের বাংলাদেশ। আমরা মনে করি, এই দেশের প্রকৃত শক্তি হলো জনগণ। আর সেই শক্তিতেই আমরা ন্যায়বিচার, সংস্কার ও নতুন সনদের পথে এগিয়ে যাব।’
একই দিন দিনাজপুরে সমাবেশে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আর অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক বৈষম্য থাকবে না। আমরা সম্পদের সুষম বণ্টন চাই।’
তিনি দিনাজপুরের কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘তারা দেশের অন্যতম খাদ্য উৎপাদক, অথচ বছরের পর বছর অবহেলিত।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই ঘোষণা বিলম্বিত হলেও এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যাঁরা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, তাঁদের ত্যাগকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে।’