।। মো. আসাদুজ্জামান।।
সাতক্ষীরা, ৩০ আগস্ট, ২০২৫ (বাসস): বর্ষা মৌসুমে নদ-নদীর উপচে পড়া পানি ও জলাবদ্ধতার কারণে সাতক্ষীরার কিছু কিছু এলাকা বছরে প্রায় ৬ মাসেরও বেশি সময় জলমগ্ন থাকে। ফলে চলাফেরার জন্য দেশের দক্ষিণের এ জনপদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নৌকার ব্যবহার। স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতেই জেলার পাটকেলঘাটায় সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের পাশে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০টি নৌকা তৈরির কারখানা। দিন-রাত কর্মব্যস্ততায় মুখর কারখানাগুলো।
কেউ কাঠ কাটছেন, কেউ নৌকার দাড়া (কাঠামো) সেট করছেন, কেউ কাঠ জোড়া লাগাচ্ছেন, কেউ বা মেশিন দিয়ে ফিনিশিংয়ের কাজ করছেন, কেউ আবার নৌকার গায়ে আলকাতরা লাগাচ্ছেন। যে যার কর্মযজ্ঞ নিয়ে ব্যস্ত। দম ফেলার সময় নেই কারুর। আর এ কারখানা থেকে প্রতিবছর অন্তত দুই হাজার নৌকা বিক্রি হয় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র এই তিন মাস নৌকা তৈরির মৌসুম বলা হলেও প্রায় সারা বছরই চলে এখানে নৌকা তৈরি ও বেচাকেনা। এখানকার তৈরি নৌকা জেলার মানুষের চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী জেলাসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হচ্ছে। আর এ শিল্পের সাথে জড়িত বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী নৌকা শিল্পের উপর নির্ভর করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে।
কারিগরদের মেধা আর শ্রমে মাত্র দুই থেকে তিন দিনেই তৈরি হয় একেকটি নৌকা। এরপর তা চলে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আর এসব নৌকাই সারাদেশে বিশেষভাবে পরিচিত করে তুলেছে পাটকেলঘাটাকে। সারাবছর নৌকা তৈরি হলেও বর্ষা মৌসুমে এর চাহিদা ও কদর বাড়ে কয়েক গুণ। সেসময় কারিগরদের কর্মব্যাস্ততাও বাড়ে।
স্থানীয়রা জানান, সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়ক ধরে যেতে পাটকেলঘাটা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রাস্তার দুই ধারে কয়েক যুগ আগে গড়ে উঠেছে সুমি ফার্নিচার অ্যান্ড নৌকা কারখানা, তৈয়াবা ফার্নিচার অ্যান্ড নৌকা কারখানা, রহমান ফার্নিচার অ্যান্ড নৌকা কারখানা, আল ইমরান ফার্নিচার অ্যান্ড নৌকা কারখানা, রফিক নৌকার কারখানা, মেসার্স ঐশী নৌকা কারখানা ও তৈয়াবা নৌকা কারখানাসহ প্রায় ২০টি নৌকা তৈরির কারখানা। নৌকা তৈরির এ ক্ষুদ্র শিল্পে কর্মসংস্থান হয়েছে শতাধিক মানুষের।
স্থানীয় কারখানা মালিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাটকেলঘাটায় ট্রলার, পাল তোলা, কোশা কিংবা ডিঙি সব ধরনের নৌকাই তৈরি হয়। যার মূল্য ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সাইজ অনুযায়ী কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত। এখানে তৈরি নৌকা জেলার চাহিদা মিটিয়ে খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, নড়াইলসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যায়। অনেকে এসে রেডিমেড নৌকা কিনে নিয়ে যান। আবার অনেকে নিজেদের পছন্দমতো অর্ডার দিয়ে তৈরি করিয়ে নেন।
এসব নৌকা তৈরিতে মূলত মেহগনি, খৈ ও চম্বল কাঠ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া পেরেক, তারকাঁটা ও জলুয়া ব্যবহার করা হয়। একেকটি মাঝারি নৌকা বানাতে দুই জন কারিগরের দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, কাঠ ও অন্যান্য উপকরণের দাম যেমন বেড়েছে, বেড়েছে কারিগরদের মজুরিও। এতে নৌকা উৎপাদনের খরচও আগের তুলনায় বেড়েছে। এজন্য কিছুটা বাড়তি দামেই নৌকা বিক্রি করতে হয়।
পাটকেলঘাটা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল লতিফ সরদার বাসসকে বলেন, প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পাটকেলঘাটার নৌকার সুনামকে কাজে লাগিয়ে এ শিল্পে আরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, নৌকার জন্য প্রসিদ্ধ সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা। এ শিল্পকে কেন্দ্র করেই স্থানীয় বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। সরকার একটু নজর দিলে এ শিল্পের সম্প্রসারণ সম্ভব। যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে আনবে।
সাতক্ষীরা বিসিক শিল্প নগরীর উপ-ব্যবস্থাপক গৌরব দাস বাসসকে বলেন, সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটায় যারা নৌকা নিয়ে কাজ করেন তাদের ওখানে আমরা বিভিন্ন সময় পরিদর্শন করেছি। নৌকা তৈরির কারিগরদের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করে এই কর্মকর্তা আরো জানান, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আওতায় বিসিক থেকে যে ঋণের সুবিধা রয়েছে আমরা তাদের সেই ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করতে পারি।