সিলেট, ৩১ আগস্ট, ২০২৫ (বাসস) : উপমহাদেশের প্রাচীনতম চা-বাগান হিসেবে পরিচিত সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগান দ্রুতই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। দেশের ভেতর ও বিদেশ থেকে আগত পর্যটকরা এখন নিয়মিতই ছুটে আসছেন এই সবুজের সমারোহ, ঔপনিবেশিক যুগের ঐতিহ্য ও নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
১৮৫৪ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত মালনিছড়া চা-বাগান সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মাত্র কয়েক মিনিট দূরত্বে সিলেট এয়ারপোর্ট সড়কের পাশে অবস্থিত।
প্রায় ১,৫০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এ চা-বাগানটি দেশের বৃহত্তম চা-বাগানগুলোর একটি এবং এ অঞ্চলটির চা-সংস্কৃতির প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালনীছড়ায় পর্যটকের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে প্রকৃতিপ্রেমী, আলোকচিত্রী এবং ঐতিহ্যপ্রেমী পর্যটকদের মধ্যে। পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে থাকা চা-বাগান, হাঁটার সরু পথ এবং প্রাকৃতিক ঝরনাধারা একে সিলেট অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত করেছে।
সিলেট ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন বলেন, ‘আমরা এখন ট্যুর অপারেটরদের বাড়তি আগ্রহ দেখতে পাচ্ছি। তারা এখন সিলেট ভ্রমণসূচির আবশ্যিক অংশ হিসেবে মালনীছড়াকে বেছে নিচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘পর্যটকদের কাছে এ বাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ঐতিহাসিক গুরুত্বও বড় আকর্ষণ।’
পরিবার নিয়ে এখানে বেড়ারত আসা পর্যটক শওকত আলী বলেন, ‘মালনীছড়া চা-বাগানের শান্ত ও নির্মল পরিবেশে ভ্রমণ আমাদের আনন্দ দিয়েছে। দৃশ্যমান সৌন্দর্য ছাড়াও পরিবেশটা ছিল দারুণ।’
চা-বাগানের ভেতরে ছোট দোকান চালানো আশা বারি জানান, প্রতিদিনই অনেক পর্যটক আসেন, তবে সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটির দিনে এ সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। বাগানটি এখন বিনোদন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
এটি রত্নগিরি জলাবন (রাতারগুল), জাফলং এবং লালাখালের মতো প্রধান পর্যটনকেন্দ্রের কাছাকাছি হওয়ায় ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভ্রমণকারীদের জন্য এটি এখন এক অনন্য গন্তব্য।
এছাড়া বিমানবন্দর থেকে মাত্র ১৫ মিনিট দূরত্বে হওয়ায় মালনীছড়া একটি স্বল্প সময়ের ভ্রমণ বা ট্রানজিট পর্যটনের জন্যও আদর্শ স্থান।
তবে পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রয়োজন। প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে—পর্যটক সেবা কেন্দ্র স্থাপন, গাইডেড ট্যুর চালু, একাধিক ভাষায় নির্দেশিকা বোর্ড বসানো এবং স্থানীয় কারুশিল্পী ও চা-শ্রমিকদের সহায়তায় স্যুভেনির মার্কেট তৈরি করা।
স্থানীয়রা বলছেন, টেকসইভাবে উন্নয়ন করা গেলে মালনীছড়া হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের ‘টি-ট্যুরিজমের’ মুখচ্ছবি, যেমনটি ভারতের দার্জিলিং।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও সিলেট সিটি করপোরেশন এ অঞ্চলে ইকো-ট্যুরিজম অবকাঠামো বাড়ানোর আগ্রহ দেখালেও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা হয়নি।
যদিও বাগানটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পর্যটন কর্তৃপক্ষের অধীনে নয়, এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা দায়িত্বশীল পর্যটন পরিকল্পনার দাবি তুলছে, যাতে এর পরিবেশগত ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ন থাকে।
বিশ্বজুড়ে ব্যতিক্রমধর্মী ও পরিবেশবান্ধব ভ্রমণস্থলগুলোর প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকায়, মালনীছড়া চা-বাগান এখন বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্যবাহী অন্যতম গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে প্রস্তুত, যেখানে ঐতিহ্য, আতিথেয়তা এবং পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিলেমিশে এক অনন্য অভিজ্ঞতা উপহার দেয়, বলেন হুমায়ুন।