রোস্তম আলী মন্ডল
দিনাজপুর, ২৩ মার্চ ২০২৫ (বাসস) : বিনা পারিশ্রমিকে নিরন্তর কাজ করে চলেছে মৌমাছি। শত কোটি টাকা আয় করে নিচ্ছেন বাগান মালিক ও মৌচাষিরা। লিচু বাগানে মৌবাক্স স্থাপন করায় শিকারি মৌমাছিরা লিচু ফুল থেকে সংগ্রহ করছে মধু। মধু চলে যাচ্ছে মৌচাষিদের ঘরে। ফুলে ফুলে মৌমাছির মধু সংগ্রহ করে বেড়ানোর মধ্যে দিয়ে লিচু গাছে পরাগায়ন হচ্ছে। বাড়ছে লিচুর গুনগত মান। ফলনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাগান মালিক ও মৌচাষি উভয়েই বিনা খরচে লাভবান হচ্ছেন।
দেশের অধিকাংশ লিচু উৎপাদিত হয় দিনাজপুরে। এবছর জেলার সদর উপজেলার লিচু বাগানগুলো থেকে এক হাজার মেট্রিক টন মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মৌ খামারিরা তাদের মধু সংগ্রহের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। যা থেকে মৌ খামারিদের আয় হবে প্রায় দুই শত কোটি টাকা।
প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাস থেকে লিচুগাছে মুকুল আসে। মুকুল আসার আগেই বাগানিরা পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। গাছে পানি দেওয়া, স্প্রে করাসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করেন। মার্চ মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি গাছ মুকুলে ভরে যায়। এসময় মধু আহরণের জন্য মৌ খামারিরা লিচুবাগানে শত শত মৌ-বাক্স স্থাপন করেন। দিনাজপুরের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মৌ খামারিরা এখানে আসেন মধু সংগ্রহের জন্য।
লিচু গাছে মুকুল থাকাকালে মৌ খামারিরা মধু সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন। এ সময় তাদের অতিরিক্ত শ্রমিক প্রয়োজন হয়। এ বছর দিনাজপুরের বিভিন্ন লিচু বাগানে সহস্রাধিক মৌ খামারি মৌ-বাক্স স্থাপন করেছেন। তাদের লক্ষ্য এক হাজার মেট্রিক টন মধু সংগ্রহ করা। এবারে তাদের উৎপাদন করা লিচুর বাগান থেকে মধুর বাজার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে দুই'শ কোটি টাকা ।
দিনাজপুর শহরের নিকটবর্তী উলিপুর গ্রামের লিচুবাগানে মৌ-বাক্স স্থাপন করে তাক লাগিয়েছেন মৌ খামারি মাহবুবুর রহমান। এতে মধু সংগ্রহ যেমন লাভ হচ্ছে, তেমনি মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়নের ফলে লিচুর ফলনও বাড়ছে। এতে ওই এলাকার লিচু বাগানিরাও খুশি।
দিনাজপুর সদর উপজেলার উলিপুর গ্রামের লিচু বাগানের মালিক শহিদুল ইসলাম ও আমজাদ হোসেন জানান, তারা প্রথমে ভুল ধারণার মধ্যে ছিলেন। তাদের ধারণা ছিল লিচু বাগানের মধ্যে মৌখামারীরা মৌবাক্স স্থাপন করলে লিচু গাছের ক্ষতি ও ফলন কম হবে। কিন্তু স্থানীয় কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে তাদের সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এখন তারা মৌ খামারিদের লিচু বাগানে মৌবাক্স বসানোর জন্য নিজেরাই আহ্বান করেন।
একাধিক লিচু বাগান মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, মৌ খামারিদের মধু সংগ্রহের কারণে তাদের বাগান থেকে লিচুর অতিরিক্ত বালাই ও ক্ষতির সম্ভাবনাও অনেকটাই কমে গেছে।
দিনাজপুর সদর উপজেলা হর্টিকালচার বিভাগের মধু গবেষণায় নিয়োজিত সহকারি পরিচালক রাশেদুল ইসলাম জানান, মৌ খামারিরা দিনাজপুর সদর উপজেলাসহ ১৩টি উপজেলায় অবস্থিত হাজার হাজার লিচু বাগানে এই মৌসুমে লিচুর মুকুল থেকে তাদের শিকারি মৌমাছি দিয়ে মধু সংগ্রহ করে বিপ্লব সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, এবারে শুধু দিনাজপুর সদর উপজেলাতে শতাধিক মৌ খামারি এবং তাদের সাথে প্রায় ৩ হাজার মধু সংগ্রহকারী কর্মী এই কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। মৌ খামারিদের সফল ভাবে মধু সংগ্রহ কাজে সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে দিনাজপুর সদর উপজেলার হর্টিকালচার বিভাগ। ফলে মৌ খামারিরা এই মৌসুমে নিরাপদে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে লিচু বাগানগুলোতে মধু সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত রয়েছে।
সদর উপজেলার মাছিমপুর আউলিয়াপুর পুলহাট, মহাব্বতপুর, চেরাডাঙ্গী, শিকদার হাট, ফাসিলাডাঙ্গী, জালালপুর, মহেশপুরসহ সব গ্রামেই প্রায় কম বেশি লিচু বাগান রয়েছে। এবারে প্রত্যেকটি বাগানে মৌ খামারিরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে মধু সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। মৌসুমের শুরু থেকেই তারা প্রতিদিন সফলভাবে মধু সংগ্রহ করছেন।
দিনাজপুরের সদর উপজেলা, বিরল, চিরিরবন্দরসহ ১৩টি উপজেলায় লিচু চাষ হয়েছে। এ বছর ৭ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছে এবং লিচু বাগানের সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজারের বেশি। সদর উপজেলার মাসিমপুর ও বিরলের মাধববাটিতে মৌ-বাক্স স্থাপনকারী খামারির সংখ্যা বেশি।
সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের মাউদ পাড়ার লিচু বাগানে রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও মাহবুবুর রহমান মিলে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি মৌ-বাক্স স্থাপন করেছেন। তাদের খামারে আরও ১০ জন যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
মৌ খামারি রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘সারা বছর আমরা লিচুর মুকুল থেকে মধু আহরণের অপেক্ষায় থাকি। এবার মার্চ মাসের শুরুতেই ৪৫০টি বাক্স স্থাপন করেছি। আশা করছি, মাসে ২০০ মণ মধু আহরণ করতে পারবো। প্রতিটি বাক্স থেকে দৈনিক ৬ থেকে ৭ কেজি মধু সংগ্রহ করতে পারছি।’
মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের খামারে ১০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। আমরা ৬ থেকে ৭ দিন পর মধু হারভেস্ট করি। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি মধু সংগ্রহ সম্ভব হবে।’
লিচু বাগানি মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার এক একর জমিতে লিচু বাগান রয়েছে। মৌ খামারিরা মৌ-বাক্স স্থাপন করায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ফলন বৃদ্ধি পায়। লিচু বাগানে আলাদা পাহারাদারেরও দরকার হয় না।’
মাসিমপুরের লিচু বাগানি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘মৌ-বাক্স স্থাপন করায় মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়ন হয়। ফলে লিচুর আকৃতি, মিষ্টতা ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। স্প্রের প্রয়োজন কম হয়, খরচও কমে যায়।’
মধু ক্রেতা কলেজ শিক্ষক লুৎফর রহমান বলেন, ‘লিচুর ফুলের খাঁটি মধু সরাসরি খামারিদের কাছ থেকে কিনতে পারছি। বাজারের তুলনায় কম দামে লিচুর মকুল থেকে সংগ্রহ করা খাঁটি মধু পাচ্ছি। এটা একটা স্বস্তির ব্যাপার।’
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক জাফর ইকবাল বলেন, ‘লিচু বাগানে পরাগায়নের জন্য মৌ-বাক্স স্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে লিচুর উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং বিপুল পরিমাণ মধু আহরণ সম্ভব হয়। এতে অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। মৌ-বাক্স স্থাপন দু'পক্ষের জন্যই লাভ জনক।
তিনি বলেন, একদিকে মধু খামারিরা মধু সংগ্রহ করে তারা আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছেন। তাদের সংগ্রহ করা মধু দেশের মানুষের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে। এছাড়া মধু খামারিরা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে মৌ খামারিদের শিকারি মাছির মাধ্যমে পরাগায়নে লিচুর ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে লিচু বাগান মালিকরা বিনা খরচে লাভবান হচ্ছেন।