ঢাকা, ২২ মার্চ, ২০২৫ (বাসস): প্রাচীন যুগে যেখানে নারীর হাতে বোনা বীজ দিয়ে চাষাবাদের প্রচলন হয়েছে, মানুষ পশুপালন সভ্যতা থেকে কৃষি সভ্যতার দিকে এগিয়ে গিয়েছে, সেখানে কৃষিক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা কতটুকু তা সহজেই অনুমেয়।
গ্রাম বাংলার নারীদের কাছেও অনেক কাজের মধ্যে কৃষিই গুরুত্বপূর্ণ। বীজ সংরক্ষণ ও বপন থেকে শুরু করে, চারা রোপণ, সেচ, ফসল উত্তোলন এমনকি বিপণনেও নারীরা এককভাবে ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন শুধু বীজ সংরক্ষণ কিংবা আনুষাঙ্গিক কাজেই নয় বরং কৃষি গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা। তাদেরই একজন হোমায়রা জাহান সনম।
যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কৃষিভিত্তিক জনপদ হাওরের প্রত্যন্ত গ্রামে। গ্রামের সোঁদা মাটির গন্ধ আর কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এক নারী হোমাইরা জাহান সনম।
বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশার বড়ই গ্রামে। হাওর পাড়ের সেই মেয়েটি আজ বাংলাদেশের গর্ব। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৃষি গবেষণায় বিশেষ ভূমিকা রেখে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন তিনি।
হোমাইরা প্রথম বাংলাদেশি নারী, যিনি আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এশিয়া-প্যাসিফিক অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইন্সটিটিউশনসে (এপিএএআরআই) টেকনিক্যাল অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছেন। একাগ্রতা আর আগ্রহ দিয়ে কর্মস্থলে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন তিনি।
সম্প্রতি এক আলোচনায় উঠে এসেছে সনমের এগিয়ে যাওয়ার গল্প। প্রথমেই তুলে ধরলেন শৈশবের সংগ্রামমুখর জীবনের কথা। জানা যায়, সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলে কাটানো হোমাইরার শৈশব ছিল সংগ্রামমুখর। বড়ই গ্রাম থেকে স্কুলে যেতে প্রতিদিন ৩ কিলোমিটার পথ হেঁটে পাড়ি দিতে হতো। গ্রামের মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত, কিন্তু হোমাইরার অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর স্বপ্ন তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
সনম বলেন, বিয়ের চাপ থেকে শুরু করে পারিবারিক নানা চাপ; কখনও ধৈর্যহারা হইনি। মাকে পাশে পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়েও বাধার মুখোমুখি পড়তে হয়েছে।
তবে ভর্তি হওয়ার পর বাবাও সাপোর্ট দিয়েছেন অবিরত।
প্রচলিত ধ্যানধারণার বাইরে গিয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন সনম। কৃষিতে স্নাতক ও কীটতত্ত্বে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। ছোটবেলায় সেনা কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি তাঁর। তবে নতুন স্বপ্নের পথে এগিয়ে যান তিনি। তা হলো কৃষি গবেষণা। সনম বলেন, জন্ম হাওর পাড়ে হওয়ায় কৃষি নিয়ে একটা অভিজ্ঞতা তো ছিলো-ই। তবে কৃষি বিষয়ে পড়তে এসে কৃষির যাবতীয় বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো আমায় নতুন করে জানার সুযোগ করে দিয়েছে।
স্নাতকোত্তর শেষ করে সনম বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। ওই সময়টায় পারিবারিক দায়িত্ব সামলাতে সামান্য বিরতি নেন কাজ ও গবেষণা থেকে। এরপর সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড বায়োসায়েন্সেস ইন্টারন্যাশনালে বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। মাত্র এক বছরের মধ্যে কর্মদক্ষতা ও নিষ্ঠার প্রমাণ দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নিজের জায়গা করে নেন সনম।
এর মাঝে ২০২৪ সালে হোমাইরা এপিএএআরআইয়ে টেকনিক্যাল অফিসার হিসেবে যোগ দেন। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন তিনি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি বাণিজ্যে স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর কাজ প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে।
২০১৩ সালে আইএলও শ্রমশক্তি জরিপের কথা উল্লেখ করে কৃষিতে নারীর অবদানের বিষয়টি তুলে ধরেন সনম। তিনি বলেন, ওই জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট এক কোটি ২০ লাখ নারী শ্রমিকের মধ্যে ৭৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৯২ লাখ নারীই কৃষিকাজ, মৎস্যচাষ ও সামাজিক বনায়নের সাথে জড়িত। একই তথ্য পাওয়া যায়, বিবিএস এর তথ্য পর্যালোচনা করলেও। সেক্ষেত্রে সামগ্রিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় (কৃষি-বন-মৎস্য খাত) নারীর অংশগ্রহণ অনেকাংশে বেড়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘তবে দুঃখজনক হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কৃষিখাতে এ বিপুল জনগোষ্ঠীর দেওয়া শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন করা হয় না। সেজন্য উচ্চ পর্যায়েও কৃষিতে দক্ষতা সমৃদ্ধ নারীর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাজ করতে হবে।’
সেজন্যই ভবিষ্যতে সনমের স্বপ্ন কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো ও প্রযুক্তিনির্ভর টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। নিজের অভিজ্ঞতা ও গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষি খাতকে সমৃদ্ধ করতে চান। ভূমিকা রাখতে চান সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে।
কৃষি গবেষণায় নারীদের এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি পুরো কৃষি খাতের ওপরই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের পরিচালক (গবেষণা) তমাল লতা আদিত্য। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এই ছাত্রী বলেন, এখন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। ১৯৮৭ সালে আমরা যখন পড়েছি তখন ১০ থেকে ১২ শতাংশ ছাত্রী ভর্তি হতেন। এখন কৃষিশিক্ষায় ছাত্রীদের এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই পুরো কৃষি খাতের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, ‘এরই ধারাবাহিকতায় নতুন জাত উৎপাদনসহ কৃষিশিক্ষায় নারীরা এখন সনমের মতো ভালো করছেন। চাকরির বাজার প্রসারিত হওয়ায় এবং কৃষি গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষির প্রতি উদ্বুদ্ধ হওয়ায় কৃষিশিক্ষায় নারীরা এগিয়ে আসছে। যারা দেশ-বিদেশে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে চলবে।’
সনম প্রমাণ করেছেন, দৃঢ়সংকল্প ও কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি চেষ্টা অব্যাহত রাখলে মানুষ অনন্য উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে যেতে পারে। তাঁর পথচলা বাংলাদেশের নারীদের জন্য এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।