স্বৈরাচার পতনের জন্য জীবন দিলেন সাকিব

বাসস
প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৫, ০৯:২৩
শহীদ মো. সাকিব হাসান -ছবি : বাসস

প্রতিবেদন : সৈয়দ এলতেফাত হোসাইন

ঢাকা, ১৯ মার্চ ২০২৫ (বাসস) : রাজধানী ঢাকার দনিয়া কলেজের বিএ পাস কোর্সের ২২ বছর বয়সী ছাত্র মো. সাকিব হাসান ১৮ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে শহীদ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

সেদিন সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়ীর পকেট গেট এলাকায় ডেমরা রোডে পুলিশি দমন অভিযানের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাকিব। ওই সময় সরকার চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সরকার কঠোর দমন-পীড়ন চালাচ্ছিল।

এই মর্মান্তিক ঘটনা সাকিবের পরিবারে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে। তাদের স্মৃতিচারণায় উঠে আসে স্বপ্ন, মানবতা আর অন্যদের সেবায় নিবেদিত এক তরুণের গল্প।

সাকিব দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট ছিলেন। তার বড় ভাই মেহেদি হাসান (২৬) একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে বিএসসি শেষ করে ভালো একটি চাকরির সন্ধানে ছিলেন।

সাকিবের বাবা ৫৫ বছর বয়সী মর্তুজা আলম, সম্প্রতি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড়ের বাসায় বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করেন, ‘আমার ছেলে বাড়িতে নামাজ পড়ে বের হয়েছিল। আসরের নামাজের সময় বাড়িতেই ছিল। তখন ওর মা বুকে ব্যথার জন্য ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছিল।’

তিনি বলেন, ‘ওর মা বের হওয়ার পর সাকিবও বাড়ি থেকে বের হয়। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো কাজলারপাড় এলাকায় ওর কর্মস্থল ফার্মেসিতে গিয়েছে। ওখানে সে দুই বছর মেয়াদি কোর্স শেষ করে রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিত। কিন্তু তখনই ও যে ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়েছে, সেটা ভাবতে পারিনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ইশার নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরি। আমার স্ত্রীও তখন ডাক্তার দেখিয়ে ফিরে আসেন। তিনি দেখেন, ফার্মেসিতে সাকিব নেই। রাস্তায় প্রচণ্ড গোলযোগ হচ্ছিল। পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছিল। তিনি আমাকে সাকিবের খোঁজ নিতে বলেন।’

‘আপনার ছেলে আর নেই’

আলম বলেন, ‘আমি সঙ্গে সঙ্গে সাকিবকে ফোন দিই, কিন্তু অপরিচিত একজন ফোন রিসিভ করে জানায়, সাকিব গুলিবিদ্ধ হয়েছে এবং তাকে কাজলা এলাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। আবার ফোন দিই। একই ব্যক্তি ফোন ধরে আমাকে দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলেন।’

হাসপাতালে গিয়ে তিনি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন—‘আমি দেখি, আমার ছেলের নিথর দেহ পড়ে আছে স্ট্রেচারে। ডান কানের পাশে মাথার পেছন দিক দিয়ে গুলি ঢুকে ভেতরে আটকে গিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘যখন হাসপাতালে যাচ্ছিলাম, তখন রাস্তায় পুলিশ তীব্র দমন-পীড়ন চালাচ্ছিল। তাজা গুলির পাশাপাশি টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ছিল। অনেক মানুষ সেখানেই মারা যাচ্ছিল।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ‘সেদিন পুলিশ অনেক মৃতদেহ সরিয়ে ফেলছিল। কিন্তু কিছু মানবিক মানুষ সাকিবের মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সাকিব তখনও কলেজের পরিচয়পত্র গলায় ঝুলিয়ে রেখেছিল।’

পরদিন, ১৯ জুলাই, সাকিবকে কাজলারপাড় কবরস্থানে দাফন করা হয়। 'ওরা না থাকলে আমি আমার ছেলেকে কবর দিতে পারতাম না,’ বলেন শোকাহত বাবা।

‘মায়ের হাতের খেতে চেয়েছিল সাকিব’

সাকিবের মা, ৪৮ বছর বয়সী পারভীন বেগম বলেন, 'সেদিন ও আমাকে বলেছিল, মা, তুমি আমাকে তোমার হাতে ভাত খাইয়ে দেবে? কিন্তু আমি অসুস্থ ছিলাম, পারিনি। এখন সেই কথাটা আমাকে কুরে কুরে খায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেদিন আমি ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে, আমি তো বুকে ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছি। ও আমাকে ঠাট্টা করে
বলেছিল—রাস্তায় চলে যাও, গুলি খাও, ব্যথা সেরে যাবে।’

তিনি পুলিশের নৃশংসতার নিন্দা করে বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্টে আমাদের দুই ছেলেকে বড় করেছি। কিন্তু কখনও ভাবিনি, আমাদের এক ছেলেকে এভাবে হারাব।’

তিনি জানান, সাকিব তখন আইইএলটিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ‘আমার ছেলে বেঁচে থাকলে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদেশে চলে যেত।’

'ভাইয়ের মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না’

ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শোনার পর সাকিবের বড় ভাই মেহেদির অনুভূতি ছিল যেন ‘আকাশ ভেঙে পড়েছে’। তিনি বলেন, ‘ও আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল। আমরা একই পোশাক পরতাম, রাতজেগে গল্প করতাম।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন রাতে বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়ার পর আমি ওর ফার্মেসি থেকে ফেরার অপেক্ষা করতাম, একসঙ্গে ঘুমাতে যেতাম।’

সাকিব শুধু ছাত্রই ছিলেন না, পরিবারের জন্য চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করতেন বলে জানান মেহেদি। ‘ও আমাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিত, এমনকি ভবিষ্যতে মেডিকেল প্রোডাক্টের ব্যবসা শুরু করার স্বপ্ন দেখত।’

‘আমার ভাইয়ের মৃত্যু আমাদের জীবনে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে। এখনও যখন খেতে বসি, মনে হয় সাকিব ফিরে আসবে, আমাদের সঙ্গে খাবে,’ বলেন তিনি।

‘আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই’

মেহেদি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেউ ভালোভাবে বাঁচতে পারেনি। তারা এখন চলে গেছে, কিন্তু আমাদের জীবনে ভয়ানক ক্ষত রেখে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা তো কাউকে কোনো ক্ষতি করিনি। তাহলে কেনো আমাদের এভাবে নির্মম বাস্তবতার শিকার হতে হলো? পুলিশের দায়িত্ব তো জনগণকে রক্ষা করা, গুলি করে হত্যা করা নয়।’

সাকিবের পরিবার তার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চায়।

সাকিবের মা বলেন, ‘আমি আমার ছেলের হত্যার ন্যায়বিচার চাই। এই সরকারকে অবশ্যই অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ নিরপরাধ মানুষ হত্যার সাহস না পায়।’

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
আদালতের রায়ে ক্ষমতাচ্যুত হলেন দক্ষিণ কোরিয়ার অভিশংসিত প্রেসিডেন্ট ইউন
৫ মিলিয়ন ডলারের ‘গোল্ড কার্ড’ ভিসা উন্মোচন করলেন ট্রাম্প
মাদক বহনের দায়ে গ্রেফতার কির্টন
চাঁদপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় একজন নিহত 
উৎসবমুখর পরিবেশে সাইকেল লেন দিবস উদযাপিত
বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার প্রধানের বৈঠক 'আশার আলো' তৈরি করছে: মির্জা ফখরুল
সাতক্ষীরায় দর্শনার্থীদের পদচারনায় মুখরিত রূপসী ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট
পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের টিম ওয়ার্ক, ঈদের বন্ধে চট্টগ্রামে ১০৭টি নরমাল ডেলিভারি সম্পন্ন
প্রধান উপদেষ্টা থাইল্যান্ডকে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান জানিয়েছেন 
নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে রাজনীতির আমূল পরিবর্তন করতে চায় এবি পার্টি
১০