প্রতিবেদন: সৈয়দ এলতেফাত হোসাইন
ঢাকা, ২১ মার্চ, ২০২৫ (বাসস) : ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণ-অভ্ত্থুাননে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর বিজয় উদযাপনে মেতে উঠেছিল দেশের সর্বস্তরের মানুষ। কিন্তু পুলিশের নির্বিচারে গুলিতে সেই উৎসব রক্তে রঞ্জিত হয়। রাজধানীসহ সারা দেশে প্রাণ হারায় অসংখ্য মানুষ।
৫৫ বছর বয়সী মো. আবদুর হান্নান তাদেরই একজন।
বিকেল সোয়া ৩ টায়, যাত্রাবাড়ী থানার সামনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান হান্নান। গুলি তার মাথার ডান পাশ দিয়ে ঢুকে বাম পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তার মৃত্যু কেবল একটি প্রাণ নিভিয়ে দেয়নি, ধ্বংস করে দিয়েছে একটি পরিবারকে। এখন তারা বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছেন।
শেষ দেখা, শেষ কথা
হান্নানের স্ত্রী, ৩৮ বছর বয়সী কমলা আক্তার, বাসস-এর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারবার চোখ মুছছিলেন।
তিনি বলেন, 'আমার স্বামী দুপুর ৩টার দিকে বাসা থেকে বের হন। শুনেছিলেন, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়েছে। তাই তিনি বিজয় মিছিলে যোগ দিতে যান।'
'তিনি যাওয়ার সময় মোবাইল ফোন বাসায় রেখে গিয়েছিলেন। তবে অন্য কাগজপত্র সঙ্গে নিয়েছিলেন। যাওয়ার আগে বলেছিলেন, ফিরে এসে আমাদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খাবেন,' স্মৃতিচারণ করেন কমলা।
কিন্তু মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে সব বদলে যায়। ধরে আসা কণ্ঠে কমলা বলেন, 'বিকেল সাড়ে ৩ টায় এক ছাত্র আমার স্বামীর ফোনে কল দিয়ে জানায়, তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আমি মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যাই।'
তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ডিএমসিএইচ) নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে কতর্ব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
চোখের পানি সামলানোর চেষ্টা করতে করতে কমলা বলেন, 'সেই রাতে হাসপাতাল থেকে মাত্র একটি টোকেনের বিনিময়ে স্বামীর মরদেহ বুঝে পাই। তারপর ধলপুর কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করি।'
একটি পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়
হান্নান ছিলেন চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুর পর পরিবারে চরম অনিশ্চয়তা নেমে আসে এসেছে।
২৮ বছর বয়সী ছেলে তানভীর আহমেদ চাকরির সন্ধানে আছেন। আর ২২ বছর বয়সী মেয়ে তানজিনা আক্তার সোহানা দারিদ্র্যের কারণে এসএসসি পরীক্ষাও দিতে পারেননি।
তানভীর বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ১০ হাজার টাকা বেতনে একটি চাকরি পান। কিন্তু এই উপার্জনে ১৩ হাজার টাকার বাড়ি ভাড়াও পরিশোধ সম্ভব হচ্ছে না।
কান্নাভেজা কণ্ঠে কমলা বলেন, 'আমরা তিন মাস ধরে বাড়িভাড়া দিতে পারিনি।'
তিনি আরও জানান, দারিদ্র্যের কারণে মেয়ের বিয়ে নিয়েও তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন। তিনি অসহায়ভাবে বলেন, 'আমার স্বামী ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই।
আমি বুঝতে পারছি না, মেয়ের বিয়ে কীভাবে দেব।'
সংগ্রামী জীবন ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া হান্নান তার বাবার মতোই কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন।
কমলা বলেন, 'আমার শ্বশুর যাত্রাবাড়ীতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। আমার স্বামী এখানেই জন্মেছেন ও বড় হয়েছেন।' তার শ্বশুর মো. আবদুস সোবহান হান্নানের ছোটবেলাতেই মারা যান, আর শাশুড়ি নূর জাহান বেগমও বহু আগেই প্রয়াত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
এক চোখ অন্ধ অবস্থায় শহীদ হন
হান্নান ছিলেন বিএনপি-র সক্রিয় সমর্থ। বিএনপির নানা কর্মসূচিতে অংশ নিতেন তিনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নয়াপল্টনে বিএনপির এক কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে হান্নান তার বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান।
চোখ মুছতে মুছতে কমলা বলেন, 'ডাক্তার বলেছিলেন, লাখ-দেড় লাখ টাকা হলে অস্ত্রোপচার করে চোখের দৃষ্টি ফেরানো সম্ভব। কিন্তু আমাদের সে সামর্থ্য ছিল না। আজ আমার স্বামী এক চোখ অন্ধ অবস্থায় শহীদ হয়েছেন, এটা আমার জন্য চরম বেদনার।'
এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েও পরিবারের জন্য কাঠমিস্ত্রির কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন হান্নান।কিন্তু তার মৃত্যুর পর পরিবার এখন স্বজনদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল।
কমলা বলেন, 'আমার বাবা বহু বছর আগেই মারা গেছেন। এখন আমার কোনো আশ্রয় নেই। দুই ভাই ও আত্মীয়দের সহায়তায় কোনোরকম টিকে আছি। তবে তারাও নিজেদের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।'
সহায়তার আকুতি
সরকার থেকে এখনও কোনো সহায়তা পাননি জানিয়ে কামালা বলেন, 'জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা পেয়েছি, যা মেয়ের বিয়ের জন্য ব্যাংকে রেখেছি। কিন্তু এই সামান্য অর্থ দিয়ে কীভাবে ভবিষ্যৎ গড়ব?'
তিনি বলেন, 'আমি সরকারের কাছে আমার ছেলের জন্য একটা ভালো চাকরির ব্যবস্থা করার এবং মেয়ের বিয়েতে সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানাই।
সেটাই হবে আমাদের জন্য আশীর্বাদ।'
তিনি সরকারের প্রতি ‘জুলাই বিপ্লবে’ শহীদদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর এবং অর্থনৈতিক ও মানসিক সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানান।
ন্যায়বিচারের দাবি
কামালা তার স্বামীর হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে বলেন, 'খুনিদের বিচার হতে হবে। আমাদের মতো প্রতিটি পরিবার, যারা তাদের প্রিয়জন হারিয়েছে, তারা সবাই ন্যায়বিচার চায়। আমি খুনিদের ফাঁসি চাই।'