প্রতিবেদন : জাহিদুল ইসলাম জয়
নরসিংদী, ২২ মার্চ, ২০২৫ (বাসস) : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘ চিকিৎসার পর জীবন-মৃত্যুর সংকট কাটিয়ে সুস্থ হয়েছেন নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার বাড়ৈআলগী গ্রামের মাঈন উদ্দিন (২৪)। তবে তার ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে গভীর শঙ্কা থেকে গেছে।
মাঈন উদ্দিন একজন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক। তার উপার্জনে স্ত্রী ও চার বছরের কন্যাসন্তানসহ সংসার কোনো রকমে চলত।
গত বছরের ১৯ জুলাই, শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের দাবিতে ইটাখোলা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। আন্দোলনের সময় পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে তার ডান হাতে ও পেটে আঘাত লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকদের মতে, গুলির আঘাতে মাঈন উদ্দিনের খাদ্যনালী ছিদ্র হয়ে যায়। জরুরি ভিত্তিতে তার পেটে রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি করা হয় এবং কোলোস্টমি ব্যাগ স্থাপন করা হয়। এরপর থেকে তার মলত্যাগ সম্পূর্ণ কোলোস্টমি ব্যাগের মাধ্যমে হতে থাকে।
দীর্ঘ চিকিৎসার পর গত বছরের ২৩ অক্টোবর পুনরায় রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারির মাধ্যমে কোলোস্টমি ব্যাগ অপসারণ করা হয় এবং তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।
নরসিংদী জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ এন এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘মাঈন উদ্দিনের শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ছিল। কোলোস্টমি ব্যাগের কারণে তার দৈনন্দিন জীবন ছিল অস্বাভাবিক ও কষ্টকর। তবে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন।’
তিনি বলেন, ‘এখন তিনি স্বাভাবিক নিয়মে মলত্যাগ করতে পারছেন। তবে তাকে আজীবন শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে।’
মাঈন উদ্দিনের পরিবার জানায়, চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। পরিবার ও আন্দোলনকারীদের সহযোগিতায় চিকিৎসার ব্যয় মেটানো সম্ভব হলেও মাঈন উদ্দিনের কাজ করার সক্ষমতা এখন আর আগের মতো নেই।
মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব। আল্লাহর অশেষ রহমত এবং চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টায় নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি। কিন্তু এখন ভারী কাজ করতে পারব না। আমার জন্য যদি কোনো চাকরি বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে পরিবার নিয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকতে পারব। এটি সরকারের কাছে আমার বিনীত আবেদন।’
তত্ত্বাবধায়ক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘মাঈন উদ্দিন শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও তাকে সবসময় চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। তার মতো একজন তরুণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমরা চিকিৎসক হিসেবে গর্ব অনুভব করি। তবে তার আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারসহ সমাজের সকলের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।’
মাঈন উদ্দিনের জীবনসংগ্রাম কেবল তার ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প নয়; এটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ ও লড়াইয়েরও গল্প।