প্রতিবেদন : নুসরাত সুপ্তি
নারায়ণগঞ্জ, ২২ মার্চ, ২০২৫ (বাসস) : দিনটা ছিল ২১ জুলাই, একটু পর পর গুলির বিকট শব্দ। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া, পাল্টা-ধাওয়া। মাথার ওপরে হেলিকপ্টারের ওড়াউড়ি। কালো ধোঁয়ায় ছাওয়া আকাশ। চারদিকে আতঙ্ক। এমন পরিস্থিতিতে 'বাবা তুই কিন্তু বাইরে যাইছ না। বাসা থেকে কেউ বের হবি না' বলে ছেলেকে কড়া ভাষায় সতর্ক করলেন খালেদা কবির।
কিন্তু খালেদা কবিরের ছোট সন্তান আহসান কবির শরীফ। মাকে না জানিয়ে বের হয়ে পড়েন আন্দোলনে। ছেলেকে তার ঘরে না পেয়ে খোঁজাখুজি, একের পর এক ফোন দিয়েই চলছেন তাকে। কয়েক ঘণ্টা পেরোলেও ছেলের সন্ধান পাচ্ছিলেন না তিনি। সেদিন ছেলে বাড়ি না ফিরলেও, ফিরেছে তার লাশ।
বৈষ্যম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে মারা গেছেন আহসান কবির শরীফ। তিনি ডেমরা থানার দক্ষিণ সানারপাড় এলাকার বাসিন্ধা। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় হেলিকপ্টার থেকে ছোঁড়া গুলি তার বুকে এসে বিঁধে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার হওয়ার সাথে সাথে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি।
অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক হুমায়ুন কবির (৬৫) ও খালেদা কবির (৫৫) -এর ছোট সন্তান শরীফ (৩৩)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এক বুলেটেই শেষ হয়ে গেছে তার ও তার পরিবারের সব আনন্দ-উচ্ছাস, স্বপ্ন।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চাকরি, বাড়ি ফিরে ভাতিজির সাথে খুনসুঁটি, মা-বাবার সঙ্গে সময় কাটানো- এরকমই ছিল শরীফের দৈনন্দিন সময়সূচি। বড় ভাই মাহবুব (৩৬) প্রবাসী ও বোন রোকেয়া (৩৯) বিয়ের পর মিরপুরে থাকেন।
সারা শরীরে একাধিক রোগ নিয়ে প্রায় বিছানায় শয্যাশায়ী খালেদা কবির। হাঁটুতে একবার অপারেশন করিয়েছেন। তবুও লাঠিতে ভর করে কোনরকমে হাঁটেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তার। তিনি বলেন, মায়ের আগে তার ছেলে মারা গেলে সেই মায়ের পৃথিবীতে থাকা আর না থাকা একই। আমার পায়ে অনেক যন্ত্রণা।
'অফিস থেকে আইসা শরীফে আইসা পায়ে মালিশ কইরা দিত। ওয় যাওনের পর আরও অসুস্থ হয়ে গেছি। শরীফ ছেলেটা থাকলে এতোদিনে আমার অপারেশন হয়ে যাইত,' কথাটা বলে অনেকক্ষণ কাদঁতে থাকেন তিনি।
ছেলে হারানো সেই ভয়ংকর দুপুর স্মরণ করে খালেদা কবির বলেন, আমার বড় ছেলে বিদেশে থাকে। নাতিনটা (সারাহ) সারাদিন চাচার সাথেই থাকত। শরীফও সারাহ যা খাইতে চাইত তাই নিয়া আসত।
দুপুরে আমাদের খাওয়ার পর আমি সারাহরে বললাম, তোমার চাচ্চু কই। ওয় বলে, চাচ্চু তো বাইরে গেছে। শুইনা আমার কলিজাটা থক কইরা ওঠে, এই গোলাগুলির মধ্যে ওয় বাইরে। ফোন দিয়েও পাই না। অনেকক্ষণ পর কয়েকজন ছেলে আইসা ওর বাবারে বলে, স্যার স্যার শরীফের গুলি লাগছে। ওর বাবায় দৌড়ে যায়।
আমি তো হাঁটতে পারি না। অনেক কষ্ট করে যাওয়া শুরু করি। ছেলেকে কোন হাসপাতালে নিছে কিছুই জানি না। ছেলের বউরে নিয়ে হাঁটতে থাকি৷ সারা রাস্তায় আল্লার কাছে দোয়া করছি, আল্লাহ আমার পোলার জবানটা রাইখো। না, পোলাটা কোনো কথা না, কইয়া চইলা গেলো।
অবুঝ শিশু সারাহ (৭)। সে এখনও মনে করে তার চাচ্চু তার জন্য চকলেট নিয়ে আসবেন। চাচ্চুর কথা উঠতেই বলে, চাচ্চু কোথায় যেন গেছে, চকলেট নিয়ে ফিরবে।
শরীফের বোন রোকেয়া (৩৯) বলেন, পাখি যেমনে শিকার করে, ওমনে হেলিকপ্টার থেকে গুলি কইরা আমার ভাইরে মারছে। ভাইটার জান নিয়ে গেছে। ওর মরণের পর আমাগো ঘরের ভরণপোষণসহ সব কিছুই এলোমেলো হয়ে গেছে। আমার বাবা ওর মৃত্যুর কষ্ট ভুলতে ঘরে থাকে না। তাবলীগ জামায়াতে ঘুরে।
শরীফের বাবা হুমায়ুন কবির নিজের ছেলে সম্পর্কে বলেন, ওইদিন আমি গেটের বাইরে দাঁড়ায় আছিলাম। এলাকার কয়েকজন আইসা আমারে হঠাৎ কয়, স্যার স্যার আপনের ছেলেরে তো গুলি করছে। আমি তো হতবাক, একটু আগে দুপুরে পোলারে দেখলাম। কি কয় এডা। ওগো লগেই যাই, গিয়া দেখি পোলার নিথর দেহটা পইড়া আছে।
ওর বুকে গুলি লাগছে৷ রাস্তায় একটাও গাড়ি নাই যে পোলাটারে হাসপাতালে নিমু। পরে কাছাকাছি সবজি ওয়ালার ভ্যানে ওঠাই। নিজেই সেই ভ্যান চালাইয়া নিয়া গেছি। হাসপাতালে গিয়াই ডাক্তাররে কই, আমার বাবাডারে বাঁচান। ডাক্তার তো করলার তিতার মতো নির্মম সত্যটা বইলা দেয় আমারে, 'আপনার ছেলে আর নাই।'
ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে এই বাবা বলেন, আমার ছেলেটা সোনার টুকরা ছিল, এই ছেলে এই যুগে কমই থাকে। এমন ছেলেরে কাইড়া নিলো খুনি হাসিনা। আমি ওর স্মৃতি নিয়ে কেমনে বাঁচুম! এজন্যই আমি ঘরের বাইরে থাকতে তাবলীগে তাবলীগে ঘুরি। আমি শেখ হাসিনার বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি চাই, ওর নির্দেশেই এতো মা-বাবার বুক খালি হইছে।
অনুদান প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, শরীফের মৃত্যুর পর জামায়াত ইসলামী থেকে ২ লাখ টাকা আর জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে ৫ লাখ টাকা সহায়তা করেছে।